মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ত্ব

জেলার কৃতি সন্তান

 

হযরত ঘাসী দেওয়ান

তাঁর আসল নাম জানা যায় না। লোকে তাঁকে হযরত ঘাসী দেওয়ান বলেই জানে। তাঁর আস্তানা ছিল সিংড়া উপজেলার চলনবিল এলাকার তিসিখালীতে। তিনি ছিলেন হযরত বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) এর অদেখা মুরীদ বা অনুসারী। প্রতি বছর চৈত্র মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দাহিয়ার বিলে ঘাসী দেওয়ানের দরগাহে ওরস বা বার্ষিক মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

 

কুবীর চান শাহ্‌

কুবীর চান শাহ্‌ এই এলাকায় আসেন ধর্ম প্রচারের জন্য। ধর্ম প্রচারের পর তিনি এখানেই ইন্তেকাল করেন। নাটোর সদর উপজেলার বাবুর পুকুর পাড় একডালা নামক স্থানে তাঁর মাজার আছে।

 

দেওয়ান সাগর

দেওয়ান সাগর ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এদেশে আগমন করেন। সদর উপজেলার দিঘাপাতিয়া ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে তাঁর মাজার বিদ্যামান।

 

পূর্বে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও নাটোরের কৃতি সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন কালী প্রসন্ন রায়, রামকান্ত রায়, রাণী হেমাঙ্গিনী দেবী, মোহিত কুমার মৈত্র, প্রমথ নাথ বিশী, গজেন্দ্রনাথ কর্মকার ও সমর পাল।

 

মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়

জগদিন্দ্রনাথ রায় ছিলেন নাটোর বড় তরফের রাজা গোবিন্দনাথের স্ত্রী ব্রজসুন্দরীর দওক পুত্র। তার আসল নাম ব্রজনাথ। ১৮৬৮ খ্রীস্টাব্দের ২৬ শে অক্টোবর নাটোরের হরিশপুর নামক গ্রামে এক সম্ভান্ত গরীব হিন্দু পরিবারে তার জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম শীনাথ রায় এবং মাতার নাম প্রসন্নময়ী দেবী। এই কৃতি সন্তান কালক্রমে জ্ঞানী-গুনী রাজনীতিবিদ ও সমাজ সংগঠক হিসাবে নাটোর রাজপরিবারের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছিলেন। জগদিন্দ্রনাথ ১৮৮৯ সালের ৯ই অক্টোবর রাজকার্যভার গ্রহণ করেন। বৃটিশ ভারতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে প্রগতিবাদী চেতনার ক্ষেত্রে তার অবদান ছিল। সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তার বিশেষ অবদান ছিল। তার রচিত উল্লেখ যোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে ‘নূরজাহান’ ’সন্ধাতারা‘ প্রধান। মহারাজরা সাংবাদিকতা ও করতেন। তিনি মানসী নামক একটি পত্রিকার ও সম্পাদনা করতেন। এ ছাড়া তার রচিত অনুবাদ সাহিত্য, ভ্রমন কাহিনী, জীবনী গ্রন্থ, কবিতা, গান এবং রাজনৈতিক প্রবন্ধ সমুহ বাংলাদেশে এককালে বিপুল আলোড়ন এনেছিল। তিনি ছিলেন সমাজ সেবক, প্রজাবৎসল এবং সত্যিকারের দেশ হিতৈষী। দানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অগ্রনী। তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি নাটোরের মহারাজা হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা। ১৮৯৩ সালে নাটোর ত্যাগ করে কলিকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯২৫ খ্রীস্টাব্দের ২৬ শে ডিসেম্বর মোটর গাড়ীর ধাক্কায় গুরুতর আহত হন এবং ০৫ জানুয়ারী, ১৯২৬ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

 

মহারানী ভবানী

নাটোর রাজবংশের প্রথম রাজা ছিলেন রামজীবন। রামজীবনের পালিত পুত্রের নাম ছিল রামকান্ত। বগুড়া জেলার অন্তর্গত আদমদিঘী উপজেলার ছাতিয়ান গ্রাম নিবাসী আত্মারাম চৌধুরীর একমাত্র কন্যা ভবানীর সাথে রামকান্তের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় ভবানীর বয়স ছিল ১৫ বছর। ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামজীবনের মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর দেওয়ান দয়ারামকে রামকান্তের অভিভাবক নিযুক্ত করেন। রামকান্ত রাজা হলেও প্রকৃতপক্ষে রাজকার্যাদি সম্পাদন করতেন দেওয়ান দয়ারাম। ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামকান্ত পরলোক গমন করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর আলীবর্দী খান রানী ভবানীর উপরই বিস্তৃত রাজশাহী চাকলার জমিদারী পরিচালনার ভার অর্পন করেন। তিনি অত্যন্ত যোগ্যতা ও নিষ্ঠার সাথে তার জমিদারী পরিচালনা করেছিলেন।

শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। তাঁর দানকৃত অর্থে বহু টোল পরিচালিত হত। জনসাধারনের সুবিধার জন্য তিনি অনেক হাট, বাজার এবং রাস্তা-ঘাট নির্মাণ করেছেন এবং পানির কষ্ট নিবারনের জন্য বহু দীঘি ও পুকুর খনন করেছিলেন। ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে ৭৯ বছর বয়সে বড়নগর রাজবাড়ীতে রাণী ভবানী মৃত্যুবরণ করেন।

 

মরমী কবি আহসান আলী

আহসান আলী ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে নওগাঁ জেলার অন্তর্গত রাণীনগর উপজেলার লোহাচুড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ণ নাম আহসান আলী খন্দকার। আধ্যাত্ব সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে আহসান আলী সাধক পুরুষ বলে গণ্য হন। ৪৫ বছর বয়সে তিনি গুরু-প্রদত্ত খেলাফত লাভ করেন। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি জেলার সিংড়া উপজেলাধীন বজরাহার গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। আহসান আলীর বহুসংখ্যক তত্ত্ব সংগীত রচনায় লালন শাহ্ এবং পাঞ্জু শাহ্ এর প্রভাব যথেষ্ট কার্যকর ছিল। তিনি ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

 

স্যার যদুনাথ সরকার

১৮৭০ সালের ১০ ডিসেম্বর সিংড়া উপজেলার ছাতারদীঘি ইউনিয়নের কড়চমাড়িয়া গ্রামে যদুনাথ সরকার জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৮৯১ সালে ইংরেজী সাহিত্য ও ইতিহাস বিষয়ে অনার্স নিয়ে বিএ পাশ করেন।

  

 

১৮৯২ খ্রিটাব্দে তিনি ইংরেজীতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে এম এ পাশ করেন। কলিকাতার রিপন কলেজে অধ্যাপনা পদে চাকুরী জীবন শুরু করে ১৯৩০ সালে তিনি চাকুরী থেকে অবসর নেন। অবসরের পূর্বে ৫ বছর তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদে আসীন ছিলেন। বৃটিশ সরকার তাঁকে ১৯২৬ সালে সি আই ই এবং ১৯২৯ সালে ‘নাইটহুড’ খোতাবে সম্মানিত করেন। ১৯৩৬ ও ১৯৪৪ সালে ঢাকা ও পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি. লিট উপাধি প্রদান করেন। ১৯৫৮ সালের ১৯ মে সোমবার তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

 

শরৎকুমার রায়

শরৎকুমার রায় ১৮৭৬ খ্রিটাব্দে দিঘাপতিয়া রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন রাজা প্রমথনাথ রায় বাহাদুর মাতা রাণী দ্রবময়ী। তিনি দয়ারামপুর এস্টেট-এ তিনশত বিঘা জমির উপরে একটি কৃষি খামার স্থাপন করেছিলেন যার নাম ‘রাণী দ্রবময়ী ফার্ম’। এ ফার্মে উৎপাদিত আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদিত হত। এ অঞ্চলে কোন চিনিকল না থাকায় ১৯৩৬ খিস্টাব্দে গোপালপুরে স্থাপিত হয় ‘নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল’।

‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ এবং ‘বরেন্দ্র মিউজিয়াম’ স্থাপন তাঁর জীবনের অক্ষয় কীর্তি। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

 

হাসার উদ্দীন কবিরত্ন

কবি হাসার উদ্দীনের জন্ম ১৯০৭ সালের ৮ই নভেম্বর কান্দিভিটুয়া গ্রামে। তিনি মহারাজা উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯২৮ সালে মহসিন বৃত্তিসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্টিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৬২ সন পর্যন্ত সরকারি চাকুরিজীবি ছিলেন। নাটোর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক "বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি গেজেট" পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্তের পর অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত তাঁর মধুপ্রশস্তি কবিতা রচনার জন্য তিনি "কবিরত্ন"  উপাধি পান।  

  

তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হলো সৌভাগ্য সোপান,গীতিনকশা,  মোড়লের বিচার,শুক্তিমালা,দ্বাদশী,হিজরত, মহোত্তম জীবন, সন্ধানে এবং তাঁর অপ্রকাশিত পান্ডুলিপির মধ্যে আছে হিলাল, বিষকুম্ভ, বেলুবন ইত্যাদি। তাঁর নিজ বাসভবন “দীন মঞ্জিল” বড়গাছা,নাটোরে তিনি ১৯৯৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন।

 

মাদার বখশ

১৯০৭ সালে নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার স্থাপনদীঘি নামক গ্রামে মাদার বখশ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম বলিউদ্দিন মন্ডল। ১৯২৮ সালে তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম,এ পাশ করেন এবং ১৯২৯ সালে তিনি বি,এল ডিগ্রী অর্জন করেন। প্রথমে ২-৩ বছর শিক্ষকতা করবার পর ১৯৩৪ সালে তিনি রাজশাহী জজ কোর্টে আইন ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি আইন ব্যবসায়ে প্রচুর খ্যাতি ও সুনাম অর্জন করেছিলেন। ওকালতি ছাড়াও তিনি রাজনীতি ও সমাজ সেবায় জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন।

  

১৯৪৭ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান আইন সভার সদস্য হিসাবে জনগণের সেবা করতে সক্ষম হন। আইন সভার সদস্য থাকা সত্ত্বেও ১৯৫০ সালে তিনি রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাপ্নিক ও স্রষ্টা। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, বাধা-বিপত্তিকে অতিক্রম করে মাদার বখশ এর বিশেষ প্রচেষ্টায় তদানিন্তন সরকার ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ ‘ রাজশাহী বিশ্ববিদালয় এ্যাক্ট’ পাশ করে এবং তারপর যথারীতি কার্যক্রম শুরু করে এবং তা বাস্তবায়িত হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগ চালু হলে তিনি শিক্ষকরূপে যোগদান করেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন। স্বাধীনতার পর তাঁর নামানুসারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নাম মাদার বখশ রাখা হয়েছে। ১৯৬৭ সালের ২০ জানুয়ারী দূরারোগ্য ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।

 

মোঃ মকসুদুর রহমান

সিংড়া উপজেলার ছিলামপুর গ্রামে ১৯৫১ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন প্রাবন্ধিক ও গবেষক। বর্তমানে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে বাংলাদেশের স্থানীয় স্বায়ত্বশাসন, নাটোরের মহারাণী ভবানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান তওব ও নীতিমালা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

 

রাধাচরণ চক্রবর্তী

সাহিত্যিক রাধাচরণ চক্রবর্তী ১৩০১ বঙ্গাব্দে ৮ই চৈত্র চৌকিরপাড় গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলির মধ্যে আলেয়া, দীপা, তিলকধারী, পল্লব, বুকের ভাষা, চক্রপাক, বৈরাগীর চর, সাওন, হোয়াইট কেবিন, ঝড়, তপ ও তাপ, ঘর মোহানী, কো-এডিকেশন, মৃগয়া, ভাঙন ইত্যাদি অন্যতম। বাংলা ১৩৪৫ সনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

এয়ার ভাইস মার্শাল খাদেমুল বাসার

খাদেমুল বাসার ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ মার্চ নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলাধীন ছাতারবাড়ীয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হাসমতুল্লাহ শাহ্ এবং মাতার নাম মোছাঃ হাছিনা বেগম।

  

খাদেমুল বাসার রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ১৯৫৩ সালে বিমান বাহিনীতে যোগ দেন এবং বিমান বাহিনী  একাডেমী থেকে গ্রাজুয়েশান ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি ক্যাডেট হিসাবে যোগদান করে ধীরে ধীরে পদোন্নতির মাধ্যমে ১৯৭০ সালে উইং কমান্ডার পদ লাভ করেন। স্বাধীনতা লাভের পর তিনি ৩ বার পদোন্নতি লাভ করেন এবং ১৯৭৬ সালের মে মাসে তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন এবং ঐ মাসেই তাঁকে এয়ার ভাইস মার্শাল পদে উন্নীত করা হয়। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য তাঁকে ‘‘বীর উত্তম’’ খেতাব প্রদান করা হয়। ১ সেপ্টেমবর, ১৯৭৬ ঢাকা বিমান বন্দরে এক বিমান দুর্ঘটনায় তিনি ইন্তেকাল করেন।

 

শঙ্কর গোবিন্দ চৌধুরী

শঙ্কর গোবিন্দ চৌধুরী এলাকার কৃতি সন্তানদের মধ্যে অন্যতম।তিনি ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে নাটোর শহরের অদূরে ছাতনী গ্রামে সম্ভ্রান্ত চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭০এবং ১৯৮১ সালে এম.পি নির্বাচিত হন।এছাড়াও ৩ বার পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন, ১৯৭৫ সালে গভর্ণর নির্বাচিত হন।জনকল্যাণমূলক কাজে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সময় ও সম্পদ অকৃপণে ব্যয় করেছেন।

  

সমাজসেবায় তাঁর অবদান সর্বজনবিদিত ও অনস্বীকার্য। তিনি নাটোরের সফল রাজনীতিবিদদের মধ্যে অন্যতম। ১৩ সেপ্টম্বর, ১৯৯৫ তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে স্মরণীয় করতে তাঁর সম্মানে ‘শঙ্কর গোবিন্দ চৌধুরী স্টেডিয়াম’টি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

 

শফীউদ্দীন সরদার

১৯৩০ সালের ১ মে নাটোর জেলার সদর উপজেলার হাটবিলা গ্রামে শফীউদ্দীন সরদারের জন্ম। ১৯৫০ সালে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন। রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে ১৯৫৫ সালে বি.এ (অনার্স) পাস করেন। পরবর্তীতে বি.এড, এম.এড এবং এম.এ (ইতিহাস) পুনরায়

  

ইংরেজীতে এম.এ পাশ করেন এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিপ্লোমা-ইন-এডুকেশন ডিগ্রি লাভ করেন।

তিনি কর্মজীবনে প্রধান শিক্ষক, অধ্যাপক, অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮২ সালে সরকারের প্রশাসনে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগ দিলেও পরবর্তীতে তা ছেড়ে দেন।

তিনি শখের বশবর্তী হয়ে মঞ্চাভিনেতা, বেতারের নাট্যকার, নাট্যশিল্প ও নাটক পরিচালনা করেন। জীবনের সন্ধিক্ষণে তিনি সার্বক্ষণিক নিজেকে লেখার কাজে নিয়োজিত রেখেছেন। বিশেষতঃ ইতিহাস কেন্দ্রিক তাঁর লেখা উপন্যাসগুলো পাঠক হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। সাহিত্যের সৃজন পথে তিনি এগিয়ে চলেছেন দীপ্তলয়ে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৫০টির ওপরে।

 

সমর পাল

সমর পাল ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর নাটোর শহরের পালপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই অত্যন্ত মেধাবী সমর পাল ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সরকারি চাকুরির সৌজন্যে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল। ইতিহাস-সাহিত্য-সংস্কৃতির সাথে তাঁর রয়েছে নাড়ির টান। যেখানেই গিয়েছেন ইতিহাস-সংস্কৃতির শেকড় সন্ধান করেছেন।

কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যা বিভাগে ফেলো হিসেবে। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে সহকারী কমিশনার হিসেবে প্রশাসনে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পদে আসীন ছিলেন। বর্তমানে তিনি অবসর জীবন যাপন করছেন।

  

ইতিহাস ও সাহিত্য কর্মে অবদানের জন্য ১৯৯৫ সালে পশ্চিম বঙ্গের শিলিগুড়িতে দার্জিলিং জেলা গ্রন্থমেলা কর্তৃক সংবর্ধিত হন। ২০০০ সালে রংপুর জেলা থেকে ইতিহাস গ্রন্থে অবদানের জন্য স্মারক সম্মান লাভ করেন। ২০০৬ খ্রিঃ এ ময়মনসিংহ লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি কেন্দ্র থেকে ইতিহাস গবেষণার জন্য সংবর্ধনা ও সম্মাননা লাভ করেন।

সমর পাল মূলত বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া প্রত্নসম্পদ, নৃতত্ত্ব, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বিস্তৃত স্থান ও ব্যক্তিত্ব, লোক সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করেছেন। তরণ প্রজন্মকে শেকড়-সন্ধানী হতে আগ্রহী করা এবং আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রকে প্রাগ্রসর করাই তাঁর লক্ষ্য।

 

 

আশরাফুল ইসলাম প্রাক্তন এম. পি

নাটোর -৩ (সিংড়া), সাবেক রাজশহী-১৬ (সিংড়া)

 

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী আশরাফুল ইসলাম জন্মে ছিলেন তৎকালীন রাজশাহী জেলার নাটোর মহকুমার সিংড়া থানার অন্তর্গত চলনবিল অধ্যুষিত তাজপুর গ্রামে ১৯২৩ সালের ১৯ শে ফেব্রুয়ারী। পিতা - ঘাসিউল্লা, মাতা- আজজান বিবি। আশরাফুল ইসলামের দেশ জুড়া রাজনৈতিক পরিচিত ছিল। তাকে চলনবিলের নয়ন মণি বলা হত। তিনি ছিলেন সিংড়া থানার আওয়ামীলীগ এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৪৪-১৯৫০ সময়ে ৩নং ইটালী ইউনিয়ন বোর্ড়ের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি নাটোর মহকুমা আওয়ামীলীগ এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

 

            আশরাফুল ইসলাম ১৯৭০ সালে আওয়ামীলীগ এর মনোনয়নে তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদে এবং ১৯৭৩ সলে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুজির নগর প্রশাসনে জোনাল এড মিনিষ্ট্রেটিভ কাউন্সিলের (পশ্চিম জোন-২) চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ১৯৬৬-১৯৭১ সময়ে বৃহত্তর রাজশাহী জেলা আওয়ামীলীগ এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭২-১৯৭৫ সাল পর্যন্ত নাটোর জেলা আওয়ামীলীগ এর সভাপতি ছিলেন। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে তিনি কারা বরণ করেন।

 

            আশরাফুল ইসলাম ১৯৭২ সালের ১১ই এপ্রিল গনপরিষদের প্রথম সভাতেই স্পীকারের দৃষ্টি আকর্ষন করে সভাকক্ষে কেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি নেই এই প্রশ্ন তোলেন এবং প্রস্তাব করেন যে, জাতির পিতার ফটো না দেওয়া পর্যন্ত হাউজ মুলতবী রাখা হোক। উপস্থিত সদস্যগন  এ প্রস্তাব সমর্থন করেন এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি হাউজে সংস্থাপিত হয়। বঙ্গবন্ধু যে, জাতির পিতা গনপরিষদেই তা সে দিন আশরাফুল ইসলামে প্রস্তাবে সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকৃত হয়।

 

            ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করলে আশরাফুল ইসলাম নাটোর জেলা বাকশালের সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত হলে তিনি দীর্ঘ ০৩ বছর ০৩ মাস বিনা বিচারে কারা ভোগ করেন।

 

            তিনি নাটোর টেলিভিশন  উপ-কেন্দ্র স্থাপন ও চলন বিল প্রকল্প প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রখেন। নিজ এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন । তিনি সাংবাদিক  জীবনে ইত্তেফাক, বাংলার বাণী ও দৈনিক দেশ পত্রিকায় নাটোর প্রতিনিধি হিসেবে গৌরবের সহিত কাজ করেন। তিনি নাটোর প্রেস ক্লাবের সভাপতি এবং সিংড়া প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। সারাজীবন তিনি দেশ ও জনগনের কল্যাণে নিজেকে  নিয়োজিত রেখেছেন। এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জীবনাবসান হয় ১৯৯১ সালের ৮ই মার্চ।

 

জাকির তালুকদার

জাকির তালুকদারের জন্ম নাটোরে, ২০ জানুয়ারি ১৯৬৫। চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক। পরবর্তীতে উচ্চতর শিক্ষা স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসা ও গবেষণা বিভাগে কাজ করছেন। বর্তমানে নতুন প্রজন্মের কথা সাহিত্যিক হিসেবে ইতোমধ্যে পাঠক-হৃদয়ে ও বোদ্ধামহলে স্থান করে নিয়েছেন।

  

এক সময় প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতিতে সরাসরি জড়িত জাকির তালুকদার বরাবর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত থাকায় তাঁর গদ্যে সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে রাজনীতি ও ইতিহাসচেতনা এসেছে ভিন্ন মাত্রা নিয়ে। কথা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ ২০০১ সালে লাভ করেছেন ‘কাগজ কথাসাহিত্য পুরস্কার’।

পূর্বে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও নাটোরের কৃতি সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন কালী প্রসন্ন রায় রামকান্ত রায়,রাণী হেমাঙ্গিনী দেবী,মোহিত কুমার মৈত্র,প্রমথ নাথ বিশী,গজেন্দ্রনাথ কর্মকার।

 

প্রফেসর ডক্টর মোঃ আশরাফুল ইসলাম

(সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত):

 

প্রফেসর ডক্টর মোঃ আশরাফুল ইসলাম  একজন সফল কবি, ছড়াকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ এবং ‘বিশিষ্ট গুণীজন’- এর নাম। চলনবিলের এই কৃতি সন্তানের জন্ম ইতিহাস-প্রসিদ্ধ নাটোর জেলার অন্তর্গত ‘শস্য- ভান্ডার’ হিসেবেখ্যাত সিংড়া উপজেলার ১০নং চৌগ্রাম ইউনিয়নের খিদিরবড়িয়া গ্রামে ১৯৪৮সালের ২৮ জুন। বিদ্যানুরাগী পিতা মোহাম্মদ সিরাজউদ্দীন মিঞা এবং মাতা উম্মে আয়েশা খাতুনের তিনি তৃতীয় সন্তান। তাঁরা ভাইয়ে-বোনে ৬ জন। শৈশব, কৈশোর আর যৌবনে তিনি পড়ালেখা করেন খিদিরবড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, সিংড়া দমদমা উচ্চ বিদ্যালয়, নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

 

তিনি ছিলেন একজন মেধাবী ছাত্র এবং প্রতিটি পরীক্ষায় মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি ১৯৬২সালে সিংড়া দমদমা উচ্চ বিদ্যালয় হতে ৮ম শ্রেণীতে জুনিয়র বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি একই বিদ্যালয় থেকে মানবিক শাখায় সর্বপ্রথম প্রথমবিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৬তে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং মাষ্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন যথাক্রমে ১৯৬৯ এবং ১৯৭০-এ। সর্বশেষ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্স্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ থেকে ‘রবীন্দ্র কাব্যে সাধারণ মানুষ’ বিষয়ে থিসিস করে পিএইচ.ডি ডিগ্রী অর্জন করেন ১৯৯৫-এ।

তাঁর সুপার ভাইজার ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর ড. খোন্দকার সিরাজুল হক এবং কো-সুপারভাইজার আইবিএস-এর  পরিচালক প্রফেসর ড. মাহ্মুদ শাহ কোরেশী। তাঁর অপর দু’জন পরীক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর ড. অরুণ কুমার মুখোপাধ্যায়। তাঁরা তাঁর গবেষণা কর্মের ভূয়সী প্রশংসা করে তাঁকে পিএইচ.ডি ডিগ্রী প্রদানের জন্য সুপারিশ করেন।

 

পেশাগত জীবনে ড. মোঃ আশরাফুল ইসলাম প্রায় চার দশক ধরে বিভিন্ন বেসরকারী এবং সরকারী কলেজে অধ্যাপনায় এবং শিক্ষা-প্রশাসনে সম্পৃক্ত ছিলেন। চাকুরী জীবনের প্রথমে তিনি গোল-ই-আফরোজ কলেজ, সিংড়া, নাটোর, আব্দুলপুর ডিগ্রী কলেজ, নাটোর এবং আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকায় অধ্যাপনা করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে পিএসসি-এর নির্বাচনী পরীক্ষায় বাংলাদেশে প্রথমস্থান অধিকার করে উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী কলেজে লেকচারার পদে যোগদান করেন। সেখান থেকে ১৪ বছর ১ মাস ৭ দিন পর সহকারী অধ্যাপকের পদোন্নতি পেয়ে তিনি ১৯৯৪-এ সাতক্ষীরা সরকারী কলেজে যোগদান করেন। সাতক্ষীরায় তাঁর অবস্থান স্বল্পকালীন।

অতঃপর তিনি একই বছরে যোগদান করেন ঈশ্বরদী সরকারী কলেজ, পাবনায়। ১৯৯৫-এ  তিনি যোগদান করেন নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা সরকারী কলেজ, নাটোরে। সেখানে তাঁর অবস্থান ৬ জুলাই ১৯৯৫ থেকে ৪ জানুয়ারী ১৯৯৯ পর্যন্ত।

 

এই সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, ছাত্র জীবনের প্রথম থেকে শেষঅবধি প্রতিটি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল থাকায় এবং পিএইচ.ডি ডিগ্রী অর্জন করায় ১০% এর আওতায় তিনি পিএসসির নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ‘সহকারী অধ্যাপক’ থেকে সরাসরি ‘প্রফেসরশীপ’ লাভ করেন।

ইতোমধ্যে রাজশাহী কলেজে বাংলা বিভাগে ‘প্রফেসর’-এর পদটি শূন্ যহয়। তিনি উক্ত পদে যোগদান করেন ৫ জানুয়ারী ১৯৯৯-এ। বাংলা বিভাগে তাঁর অবস্থান ৫ মে ২০০২ সাল পর্যন্ত। ঐসময় তাঁর যোগ্যতা এবং দক্ষতায় বাংলাবিভাগের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। তিনি নতুনভাবে বাংলা বিভাগকে সাজিয়ে তুলেন।

 

ড. মোঃ আশরাফুল ইসলাম ২০০১ সাল থেকে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের একজন ‘সিলেকশন গ্রেড প্রফেসর’। এই সময়ে বিভিন্ন সরকারী কলেজে অধ্যক্ষের শূন্য পদে পদায়নের নিমিত্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়ে ২০০২ সালে তিনি বগুড়া সরকারী আযিযুল হক কলেজে অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। তিনি ছিলেন উক্ত কলেজের ২৭তম অধ্যক্ষ। তাঁর স্বল্পকালীন কার্যকালে কলেজটির একাডেমিক এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য, বেগম রোকেয়া হলের দ্বিতল ভবনটির ৪র্থ তলার ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ।

এ কলেজে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান- ‘শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস নির্মূল ও শিক্ষার মানোন্নয়নে আঞ্চলিক কলেজ শিক্ষক সম্মেলন- ২০০২’ এর আয়োজন । ৮ সেপ্টেম্বর ২০০২-এ এখানে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রবন্ধকার হিসেবে তিনি উপস্থাপন করেন ‘শিক্ষা, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস নির্মূল ও শিক্ষার মানোন্নয়নে কতিপয় সুপারিশ’ শীর্ষক একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধ। এ প্রবন্ধে ১৭ দফা সম্বলিত সুপারিশমালায় তিনি শিক্ষা সম্পর্কে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেন- যার কয়েকটির প্রতিফলন ঘটেছে বর্তমান ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ - তে।

প্রফেসর ড. মোঃ আশরাফুল ইসলাম ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০০৩ থেকে ৪ এপ্রিল ২০০৪ পর্যন্ত রাজশাহীতে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদে আসীন ছিলেন। এখানে থাকাকালীন তিনি শিক্ষামন্ত্রণালয়ের তত্বাবধানে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং নিউজিল্যান্ ডসফর করেন। তাঁর কার্যকালে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটটির প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়।

                ২০০৪ সালের ৪ এপ্রিল বিকেলে তিনি উপ-মহাদেশের ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী কলেজে অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। এ কলেজে তাঁর সবচেয়ে বড়ো অবদান- সকল প্রতিবন্ধকতা বিদূরিত করে ও লিয়ে কামেল হযরত শাহ্মখ্দুম রূপোস (রঃ) এর দরগাহ্ চত্বরের উত্তর ও পূর্ব দিকের নতুন করে সীমানা প্রাচীর নির্মাণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন। দীর্ঘদিন যাবত ঐ দুই দিকের সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে পড়ায় দরগাহ্ শরীফের ধর্মীয় পরিবেশের ব্যাঘাত ঘটছিল। ধর্ম প্রাণ ড. ইসলাম অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানের পর এটি মেনে নিতে পারেননি। মূলত তাঁরই উদ্যোগে এবং প্রচেষ্টায় সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে  তিনি উত্তর-পূর্বদিকের দরগাহ্ প্রাচীর নির্মাণে সক্ষম হন।

                ২০০৫ সালে অধ্যক্ ষপ্রফেসর ড. মোঃ আশরাফুল ইসলাম এর কার্যকালে কলেজের জন্য প্রণীত প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনা অনুসারে ছাত্রীদের জন্য ২য় হোস্টেল নির্মাণের  ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়।  সরকারের অর্থায়নে এবং শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগের তত্বাবধানে নির্মিত হোস্টেলটি ৪র্থ তলাবিশিষ্ট-যার নাম ‘রহমতুননেছা ছাত্রীনিবাস’। এখানে ১০০ জন ছাত্রীর আবাসন সুযোগ সুবিধা রয়েছে। 

প্রফেসর ড. মোঃ আশ্রাফুল ইসলাম বাংলাদেশের শিক্ষা বোর্ডসমূহ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা সংক্রান্ত সার্বিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি কয়েক বছর যাবত বিভিন্ন পরীক্ষা কমিটির সদস্য, প্রধান পরীক্ষক এবং চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারী কর্মকমিশনের পরীক্ষক এবং বিসিএস-এর মৌখিক পরীক্ষা বোর্ডের বিশেষজ্ঞ হিসেবে গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন।

জাতীয় অনুষ্ঠানে প্রবন্ধকার এবং আলোচক হিসেবে প্রফেসর ড মোঃ আশরাফুল ইসলাম এর ভূমিকাও অনন্য। তিনি ১৯৯২ সাল থেকে পতিসরে রবীন্দ্র জন্ম  ও মৃত্যু বার্ষিকীতে প্রবন্ধ উপস্থাপন এবং আলোচনা করে আসছেন। নওগাঁ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পতিসর থেকে ১৪৬তম রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী স্মারক ‘চৈতালী’ তে প্রকাশিত তাঁর কবিতা‘ প্রিয়ার স্বরূপ’ (রবীন্দ্র কাব্য শিরোনাম নিয়ে রচিত) রবীন্দ্র ভক্তদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৪৭ তম রবীন্দ্র জন্মোৎসব স্মারক ‘পতিসর’-এ প্রকাশিত তাঁর ভিন্ন স্বাদের  রবীন্দ্র বিষয়ক কবিতা‘ উজল রবি’ সুধী জনের দৃষ্টি কাড়ে।

 

১৪৯ তম রবীন্দ্র জন্মোৎসব স্মারক ‘অনন্ত পথে’ প্রকাশিত তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধ  ‘সাধারণ মানুষের কবি রবীন্দ্রনাথ’ এবং সার্ধশত রবীন্দ্র জন্মোৎসবস্মারক ‘নবরূপে এসো প্রাণে’ প্রকাশিত অন্য একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ‘ রবীন্দ্র কাব্যে সাধারণ মানুষ: স্বরূপের সন্ধান’ রবীন্দ্র পাঠক সমাজে বহুল নন্দিত হয়েছে।

 

১৫১ তম রবীন্দ্র জন্মোৎসবস্মারক ‘পতিসর’ -এ প্রকাশিত তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধ- ‘রবীন্দ্র মননে সাধারণ মানুষ; প্রেক্ষিত কাব্য (‘বনফুল’ থেকে‘কড়ি ও কোমল’- ১৮৮০-১৮৯০) এবং ১৫২তম, ১৫৩তম       ১৫৫তম এবং ১৫৬তম রবীন্দ্র জন্মোৎসব স্মারকে লেখা এবং অনুষ্ঠানে আলোচনা কবির সাধারণ মানুষ প্রীতির এক নব দিগন্ তউন্মোচন করেছে। এছাড়া তাঁর কয়েকটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ‘বাংলা একাডেমী পত্রিকা’ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আইবিএস জার্নালে’

সমাজ সেবা এবং শিক্ষা ভাবনায় তাঁর ভূমিকা অতীব প্রশংসনীয় । এ লক্ষ্যে তিনি ‘প্রগতির পূর্বশর্ত গণশিক্ষা’, ‘বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা’, ‘আর্থ-সামজিক উন্নয়নে শিক্ষার গুরুত্ব’সহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক কথিকা প্রচারে এবং আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন। শিক্ষা বিষয়ক এ জাতীয় কথিকা ও আলোচনা নিঃসন্দেহে গুরুত্ববহ।

 

ড. মোঃ আশরাফুল ইসলাম একজন বিশিষ্ট কবি ও ছড়াকার। ১৯৬২ তে তাঁর প্রথম কবিতা ‘কুঁড়েঘর’ প্রকাশিত হয় মাসিক ‘সবুজপাতা’য় । ১৯৬৪ সালে মাসিক ‘অগ্রদূত’-এ‘ পাকনবীজির স্মরণে’ কবিতা লিখে তিনি সর্বপ্রথম পুরস্কার লাভ করেন। সেই থেকে আজো তাঁর লেখনী ধারা অব্যাহত। যে সবপত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো হলো- ‘সবুজপাতা’, ‘অগ্রদূত’, ‘ধান শালিকের দেশ’, ‘ময়ূরপঙ্খী’, ‘বনলতা’, ‘কলাবাগানবার্তা’, ‘দৈনিকবার্তা’, ‘নবতরঙ্গ’, ‘দৈনিক করতোয়া’ ইত্যাদি। তিনি কবিতা, ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী এবং গবেষণামূলক লেখায় বেশ স্বচ্ছন্দ। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রকমারি’ ২০০৮সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে তাঁর ২য় কাব্যগ্রন্ থ‘মহাকান্ডারী’ প্রকাশের পথে। তাঁর প্রকাশিতব্য আরো দুটি কাব্য- ‘জীবনতরী’ ও‘কবিতাকুসুম’। তাঁর পিএইচ.ডি থিসিস‘ রবীন্দ্র কাব্যে সাধারণ মানুষ’ বাংলা একাডেমী থেকে ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. মোঃ আশরাফুল ইসলাম এক সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের সদস্য এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ও সিনেটের সদস্য ছিলেন।

 

নিজস্ব সংস্কৃতিপ্রেমী, সমাজহিতৈষী এবং বাংলা একাডেমির জীবন সদস্য প্রফেসর ড. মোঃ আশরাফুল ইসলাম জাতীয় শিক্ষাসপ্তাহ-২০০২এ‘শ্রেষ্ঠ কলেজ শিক্ষক’ নির্বাচিত হয়ে স্বর্ণপদক লাভ করেন। তিনি জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ-২০০৭, ২০১৫ এবং ২০১৬- এ রাজশাহী বিভাগ থেকে ‘শ্রেষ্ঠ বিদ্যোৎসাহী সমাজকর্মী’ নির্বাচিত হয়ে পদক লাভ করেছেন।

২০০৮-এ নাটোর জেলা থেকে ক্রেস্ট লাভ করেছেন শিক্ষায় ‘বিশিষ্ টগুণীজন হিসেবে’। ‘সেরা আবাসিক বিদ্যুৎ গ্রাহক’ এর জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন ২০১২এ। তিনি ‘শ্রেষ্ঠ বিদ্যোৎসাহী সমাজকর্মী’ নির্বাচিত হয়ে জাতীয় পুরস্কার-‘জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক’ ২০১৬ অর্জন করেছেন ২০১৭ এ। তাঁকে পদকে ভূষিত করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রফেসর ড. মোঃ আশরাফুল ইসলাম ২০০৬ সালে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসরে যান। অবসর জীবনে ও তাঁর অবসর নেই। তিনি আজো লেখালেখিতে, অধ্যয়নে, বেতার কথনে, শিক্ষাদানে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসমূহে যোগদান এবং অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্ত।

 

 

 

 

 

 

 

 

ছবি


সংযুক্তি